পৃথিবীতে আর কত তেল জমা আছে, ফুরিয়ে যাবে কবে

· Prothom Alo

পৃথিবীর গভীরে কোটি কোটি বছর ধরে তেলের বিশাল ভান্ডার তৈরি হয়েছে। প্রাচীনকালে মারা যাওয়া বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের অবশিষ্টাংশ বালি, পলি ও পাথরের স্তরের নিচে চাপা পড়ে এই তেল তৈরি হয়। মাটির গভীরের প্রচণ্ড তাপ ও চাপের কারণে যুগ যুগ ধরে এই অবশিষ্টাংশগুলো ধীরে ধীরে তরল তেলে রূপান্তরিত হয়েছে।

প্রায় ১৬৫ বছর আগে থেকে মানুষ এই তেল উত্তোলন শুরু করেছে। প্লাস্টিক, পেট্রোল ও অ্যাসফল্টের মতো প্রয়োজনীয় জিনিস তৈরির জন্য মানুষ মাটির নিচ থেকে তেল তুলছে। সমস্যা হলো, প্রাকৃতিক এই সম্পদ তৈরি হতে যতটা সময় লাগে, আমরা তার চেয়ে অনেক দ্রুত তা ব্যবহার করে ফেলছি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে এই তেলের মজুত কি একসময় শেষ হয়ে যাবে?

Visit extonnews.click for more information.

সহজ উত্তর হলো, পৃথিবী থেকে তেল কখনোই পুরোপুরি ফুরিয়ে যাবে না। এর কারণ হলো, কিছু তেলের মজুত অ্যান্টার্কটিকার মতো অত্যন্ত দুর্গম জায়গায় রয়েছে। আবার কিছু তেল মাটির এত গভীরে রয়েছে যে সেগুলো খুঁজে বের করা বা সেখান থেকে তেল তোলা বর্তমান প্রযুক্তিতে প্রায় অসম্ভব।

বিশ্বে ঠিক কতটুকু তেল মজুত আছে তা সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের বেশ ভালো ধারণা রয়েছে। যুক্তরাজ্যের অ্যাবারডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম ভূতত্ত্বের অধ্যাপক ডেভিড ম্যাকডোনাল্ডের মতে, বিশ্বের বেশির ভাগ তেল কোথায় আছে তা আমরা জানি।

যুদ্ধ হলে তেল-গ্যাসের দাম বাড়ে কেন
বর্তমানে মাটির নিচে তেলের পরিচিত মজুত কতটুকু আছে, তাকে প্রতিবছর সারা বিশ্বে তেলের মোট চাহিদা দিয়ে ভাগ করে এই সময় বের করা হয়।

তেলের মজুত কোথায় গড়ে উঠবে, তা মূলত নির্ভর করে পৃথিবীর ভূত্বকের নড়াচড়া বা প্লেট টেকটোনিক্সের ওপর। সমুদ্রের তলদেশে যখন মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণী দ্রুত বালু বা মাটির নিচে চাপা পড়ে, তখন সেখানে তেল তৈরির উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়। পরে পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ তাপ ও চাপের কারণে সেই পদার্থগুলো তেলে রূপান্তরিত হয়। ভূত্বকের বিভিন্ন পরিবর্তনের ফলে মাটির নিচে এমন কিছু বেসিন তৈরি হয়, যেখানে এই তেল জমা থাকতে পারে। এ কারণে পৃথিবীর সব জায়গায় তেল পাওয়া যায় না, নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলেই তেলক্ষেত্র বেশি দেখা যায়।

২০২৩ সালের একটি জরিপ অনুযায়ী পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ব্যারেল তেল আছে, যা উত্তোলন করা সম্ভব। এর বাইরে আরও কিছু তেল থাকতে পারে, যা আমরা এখনো খুঁজে পাইনি। ২০১২ সালে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা অনুমান করেছিল যে এমন না পাওয়া তেলের পরিমাণ প্রায় ৫৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল হতে পারে।

তেলের খনি

মানুষ এই উত্তোলনযোগ্য তেল আর কত দিন ব্যবহার করতে পারবে, তার উত্তরটি কিছুটা জটিল। কয়েক দশক ধরে বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন বর্তমান মজুতের ওপর ভিত্তি করে প্রায় ৫০ বছরের তেল অবশিষ্ট আছে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো গত কয়েক বছর ধরে এই হিসাবটি প্রায় একই জায়গায় আটকে আছে। এর কারণ হলো তেল ফুরিয়ে যাওয়ার সময় হিসাব করার পদ্ধতি। বর্তমানে মাটির নিচে তেলের পরিচিত মজুত কতটুকু আছে, তাকে প্রতিবছর সারা বিশ্বে তেলের মোট চাহিদা দিয়ে ভাগ করে এই সময় বের করা হয়। আমরা প্রতি বছর যেমন নতুন নতুন তেলক্ষেত্র খুঁজে পাচ্ছি, তেমনি আমাদের ব্যবহারের হারও বাড়ছে। ফলে নতুন তেল পাওয়ার হার ও ব্যবহারের হার সমান হওয়ায় অবশিষ্ট সময়ের হিসাবটি খুব একটা বদলাচ্ছে না।

এআই যেভাবে বদলে দিচ্ছে ইরান যুদ্ধ
ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম বা বিপির ২০২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্ব এখন তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে।

তবে একসময় এই ভারসাম্যে পরিবর্তন আসবে। কারণ, তেল খুঁজে পাওয়ার ও তা মাটির নিচ থেকে তোলার হার সব সময় এক থাকে না। যেসব জায়গায় তেল পাওয়া সহজ, সেগুলো যখন ফুরিয়ে যাবে, তখন নতুন ক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। তখন আমাদের উন্নত প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হবে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ক্লিয়ারভিউর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেভিন বুক মনে করেন, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে মাটির নিচে তেলের সন্ধান করা আরও সহজ হবে। পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে এমন সব জায়গা থেকেও তেল তোলা সম্ভব হবে, যা আগে ছিল দুঃসাধ্য। এর ফলে ভবিষ্যতে আমাদের তেলের মজুতের হিসাব আরও বেড়ে যেতে পারে। জ্বালানি হিসেবে তেলের ব্যবহার এখনই ফুরিয়ে যাচ্ছে না।

সৌদি আরবের রাস তানুরায় সৌদি আরামকোর তেল শোধনাগার ও তেল টার্মিনাল

তেলের হিসাবের অন্য পাশে আরও একটি বড় বিষয় হলো ভবিষ্যতে এর চাহিদার পরিবর্তন। ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম বা বিপির ২০২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্ব এখন তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় তেলের চাহিদা একসময় স্থিতিশীল হয়ে পড়বে ও তারপর কমতে শুরু করবে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা ২০২৩ সালে জানিয়েছিল, ২০৩০ সালের মধ্যে তেলের ব্যবহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে ও এর পর থেকে ধীরে ধীরে তেলের চাহিদা কমতে থাকবে। এর মানে আমরা যদি তেলের ব্যবহার কমিয়ে দিই, তবে বর্তমানে যে তেলের মজুত আছে তা দিয়ে ৫০ বছরের বেশি সময় চলা সম্ভব হবে। তেলের অভাবে পৃথিবী থমকে যাবে না বা তেল শিল্প এখনই ভেঙে পড়বে না। কারণ, মাটির নিচে এখনো প্রচুর তেলের মজুত রয়ে গেছে। বরং চাহিদার পরিবর্তন ও প্রযুক্তির উন্নয়নই তেলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স, ইন্টারেস্টিং ইঞ্জিনিয়ারিংবৃদ্ধাকে ভয় দেখানোয় প্রথমবারের মতো আটক হিউম্যানয়েড রোবট

Read full story at source