ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু জানিয়েছেন, রাজ্যের জনসংখ্যা বৃদ্ধি করতে তাঁর সরকার আর্থিক প্রণোদনা দেবে। যে দম্পতির দুই বা তার বেশি সন্তান হবে তাঁদের ২৫ হাজার রুপি করে দেওয়া হবে। সন্তান জন্মের সময়েই ওই টাকা দেওয়া হবে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজ্য বিধানসভায় সরকারের এই পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী নাইডু বলেন, রাজ্যের জন্মহার মারাত্মকভাবে কমে গেছে। বর্তমানে অন্ধ্র প্রদেশে জন্মহার বা ‘টোটাল ফার্টিলিটি রেট’ (টিএফআর) ১ দশমিক ৫ শতাংশ। এই হার প্রতিস্থাপন স্তর বা ‘রিপ্লেসমেন্ট লেভেল’–এর নিচে।
নাইডু বলেন, আগামী দিনে তাঁর সরকার এই হার ২ দশমিক ১ শতাংশে নিয়ে যেতে চায়। সেই জন্য দম্পতিদের সন্তানসংখ্যা বৃদ্ধি করতে আর্থিক প্রণোদনার কথা ভেবেছে তাঁর সরকার। চলতি মাসেই এই পরিকল্পনা কার্যকর হতে পারে বলে তিনি আভাস দিয়েছেন।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘টিএফআর’ বৃদ্ধি করতে সরকার এক অভিনব পরিকল্পনা করেছে। দম্পতিরা দ্বিতীয় বা তৃতীয় সন্তানের জন্ম দিলে সরকার তাঁদের সন্তান পিছু ২৫ হাজার রুপি দেবে।
নাইডু বলেন, এটা কার্যকর হলে জনসংখ্যার হার বেড়ে যাবে এবং তা ‘খেলা ঘুরিয়ে’ দেবে।
বিধানসভায় নাইডু সরকারি যে সিদ্ধান্তের কথা জানালেন, তার ইঙ্গিত তিনি গত বছরেই দিয়েছিলেন। এর পেছনে রয়েছে ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতির এক গূঢ় অঙ্ক, যে অঙ্কে আগামী দিনে ভারতীয় সংসদে দক্ষিণি রাজ্যগুলোর তুলনায় উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্বের হার অনেক বেড়ে যাবে। অবস্থা এমনও দাঁড়াতে পারে, দাক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলোর সাহায্য ছাড়াই হিন্দি বলয়ের দল স্রেফ উত্তরাঞ্চলের প্রতিনিধিদের সমর্থনে দেশ শাসন করতে পারে।
এই আশঙ্কাতেই গত বছরের মার্চে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন দাক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলোর পাশাপাশি বিরোধীশাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের এক সম্মেলন ডেকেছিলেন। সেখানে চার রাজ্য মুখ্যমন্ত্রী ও এক রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছিল। প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, জনবিন্যাসে সামঞ্জস্য আনা পর্যন্ত লোকসভা আসনের ডিলিমিটেশন বা পুনর্বিন্যাস ৩০ বছর স্থগিত রাখা হোক।
তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীর ডাকা সেই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন কেরলমের (সাবেক কেরালা রাজ্য) বাম মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, তেলেঙ্গানার কংগ্রেসদলীয় মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডি, পাঞ্জাবের আম আদমি পার্টির মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত সিং মান ও কর্ণাটকের কংগ্রেসদলীয় উপমুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার।
স্ট্যালিন ওই সম্মেলনে চন্দ্রবাবু নাইডুকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের শরিক হওয়ার দরুণ নাইডু হাজির হননি। আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ ও ওডিশাকেও।
সম্মেলনে নাইডু উপস্থিত না থাকলেও লোকসভায় দাক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলোর আসনসংখ্যা কমে যাওয়ার সম্ভাবনায় চিন্তিত ছিলেন। সরাসরি ডিলিমিটেশনের বিরোধিতা না করেও সেই সময় তিনি বলেছিলেন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সাফল্যের কারণে লোকসভায় দক্ষিণের রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব কমানো ঠিক নয়। নাইডু তখনই জনসংখ্যা বৃদ্ধি করার ওপর জোর দিয়েছিলেন।
প্রায় এক বছর আগের সেই ভাবনাই এবার নাইডু বাস্তবায়িত করতে চলেছেন। লোকসভার আসন বিন্যাসের প্রসঙ্গ নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও এটা স্পষ্ট, জোট রাজনীতির ধর্ম মেনে কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি বিরোধিতা না করে রাজ্যের স্বার্থে তিনি তাঁর মতো করে জন্মহার বাড়ানোর এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে চলেছেন।
ভারতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ লোকসভায় রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব নির্ধারিত হয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে। ভারতে প্রতি ১০ বছর অন্তর জনগণনা হয়ে থাকে। শেষ জনগণনা হয়েছিল ২০১১ সালে। বর্তমানে লোকসভার যা আসন সংখ্যা, তা ১৯৭১ সালের জনগণনার নিরিখে।
১৯৭৬ সালে কেন্দ্রীয় সরকার জননিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি গ্রহণ করে। তখনই সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ঠিক হয়, পরবর্তী ২৫ বছর লোকসভার আসন সংখ্যায় কোনো পরিবর্তন হবে না। জননিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সাফল্য দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ২০০১ সালে আরেকবার সংবিধান সংশোধন করে সেই মেয়াদ আরও ২৫ বছরের জন্য বৃদ্ধি করা হয়। সেই নিরিখে ২০২১ সালের জনগণনার পর ২০২৬ সালে লোকসভার আসন সংখ্যা বাড়ানো হবে।
কিন্তু ২০২১ সালের জনগণনা শুরু করা যায়নি কোভিডের জন্য। সরকার তখন ঠিক করেছিল, ২০২৬ সালে জনগণনার উদ্যোগ নেওয়া হবে যাতে ২০২৭ সালের মধ্যে তা শেষ করা যায়। বর্তমান লোকসভার মেয়াদ ২০২৯ পর্যন্ত। এমন ধারণা করা হচ্ছে, বিজেপি সেই সময়েই ডিলিমিটেশন অনুযায়ী লোকসভার আসনসংখ্যা বাড়াতে চায়। সেই লক্ষ্যেই নতুন সংসদ ভবন তৈরি করা হয়েছে।
দেখা যাচ্ছে, ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী লোকসভার আসনসংখ্যা বাড়ানো হলে তামিলনাড়ুর মোট আসন ৩৯ থেকে বেড়ে হবে ৪১, কর্ণাটকের আসন ২৮ থেকে বেড়ে হবে ৩৬, তেলেঙ্গানার আসন ১৭ থেকে বেড়ে হবে ২০ এবং অন্ধ্র প্রদেশ হবে ২৫ থেকে ২৮। কেরলমের আসনের কোনো হেরফেরই ঘটবে না। এখনো ২০ আছে, তখনো ২০ থাকবে।
দাক্ষিণাত্যের প্রতিটি রাজ্য জন্ম নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। তুলনায় উত্তর ও মধ্য ভারতের হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোতে সাফল্যের হার সামান্যই। দেখা যাচ্ছে, ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী তাই উত্তর প্রদেশের আসন ৮০ থেকে বেড়ে হবে ১২৮, বিহারের আসন ৪০ থেকে বেড়ে হবে ৭০, মধ্য প্রদেশ ২৯ থেকে বেড়ে হবে ৪৭, মহারাষ্ট্র ৪৮ থেকে ৬৮।
স্ট্যালিনের ডাকা সম্মেলনে তখনই বলা হয়েছিল, কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মসূচির সাফল্যের জন্য দাক্ষিণাত্য শাস্তি পেতে পারে না। সেখানেই তথ্য সহকার দেখানো হয়েছিল, হিন্দি বলয়ে প্রভাব ধরে রাখা দলের দাক্ষিণাত্যের সাহায্য ছাড়াই সংসদ দখল করা সম্ভব।
বিজেপির শরিক ও সহযোগী হওয়ার দরুণ টিডিপি নেতা ও অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুর পক্ষে বিরোধীদের সঙ্গ দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু জনসংখ্যা কমে যাওয়ার বিপদও তিনি বিলক্ষণ বুঝছেন। সেই কারণেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার কর্মসূচি।
স্ট্যালিনের ডাকা সম্মেলনে আসনসংখ্যা ৩০ বছর স্থগিত রাখার দাবির বিরোধিতা তুখোর রাজনীতিক চন্দ্রবাবু নাইডু করেননি। তিনি জানেন, দক্ষিণের বিরোধিতা উপেক্ষা করা যেকোনো সরকারের পক্ষেই কঠিন।
