‘ইস, যদি আরও একটু বেশি বই পড়তে পারতাম’, নিজের মনে কখনো এমন আক্ষেপ করেছেন? যদি করেন, তাহলে এই দলে আপনি একা নন। আপনার মতো অনেকেই এমনটা ভাবেন। ২০২৫ সালের আমেরিকান টাইম ইউজ সার্ভে অনুযায়ী, ২০০৩ সালের পর থেকে মানুষের শখের বশে বই পড়ার হার প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে। কেন কমছে, তার অনেক রকম কারণ থাকতে পারে। হয়তো সোশ্যাল মিডিয়ার রমরমা অবস্থা কিংবা হাতের মুঠোয় থাকা হাজারো বিনোদনের সহজলভ্যতা এর জন্য দায়ী। কিন্তু কারণ যা-ই হোক, বই পড়া কমার এই ট্রেন্ডটা বেশ স্পষ্ট।
Visit lej.life for more information.
অথচ বই পড়ার কিন্তু দারুণ সব উপকারিতা আছে! এটি যেমন চমৎকার বিনোদন, তেমনি গবেষণায় দেখা গেছে, বই পড়া আমাদের মস্তিষ্ককে একদম ফিট রাখে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার মতো সমস্যাগুলোকে পিছিয়ে দিতে পারে। এসব কারণেই আমরা অনেকেই চাই আবার নতুন করে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে। কিন্তু মুশকিল হলো, অভ্যাসটা আর কিছুতেই গড়ে ওঠে না!
বই পড়া আমাদের মস্তিষ্ককে একদম ফিট রাখেতবে খুশির খবর হলো, অভ্যাস কীভাবে তৈরি করা যায়, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের বেশ কিছু চমৎকার গবেষণা আছে। চলুন জেনে নিই, বিজ্ঞানীদের পরামর্শ মেনে কীভাবে আপনি আবার বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন।
আইনস্টাইনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল যে ৫ বইগবেষণায় দেখা গেছে, বই পড়া আমাদের মস্তিষ্ককে একদম ফিট রাখে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার মতো সমস্যাগুলোকে পিছিয়ে দিতে পারে।
পুরোনো অভ্যাসের সঙ্গে নতুন অভ্যাস জুড়ে দিন
আপনি হয়তো শুনে থাকবেন, নতুন কোনো অভ্যাস গড়তে ২১ দিন সময় লাগে। এটা আসলে পপ সাইকোলজির একটা মুখস্থ বুলি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় কিন্তু এর কোনো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অস্ট্রেলিয়ার একদল গবেষকের গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে কোনো অভ্যাস পুরোপুরি গড়ে উঠতে অন্তত দুই থেকে পাঁচ মাস সময় লাগতে পারে। তাঁদের এই গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে হেলথকেয়ার জার্নালে।
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগের সময়টাতে বই পড়ার অভ্যাস করা যেতে পারেগবেষকেরা বলছেন, অভ্যাস গড়ার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো আপনার আগের কোনো রুটিনের সঙ্গে নতুন কাজটাকে জুড়ে দেওয়া! ধরুন, সকালে নাশতা করার আগে আপনার এক কাপ কফি খাওয়ার অভ্যাস আছে। কফি খাওয়ার ওই সময়টাতে ফোন না টিপে একটা বই হাতে নিতে পারেন। অথবা, আপনি যদি প্রতিদিন বাসে বা ট্রেনে করে অফিসে যান, তবে পথের সঙ্গী হিসেবে একটা বই সঙ্গে রাখুন। আর নিজে ড্রাইভ করলে অডিওবুক শুনতে পারেন। রাতে দাঁত ব্রাশ করার পর ঘুমাতে যাওয়ার আগের সময়টাতেও বই পড়ার অভ্যাস করা যেতে পারে। এভাবে আপনার রোজকার রুটিনের সঙ্গে বই পড়াকে জুড়ে দিলে অভ্যাসটা ধরে রাখা অনেক সহজ হয়ে যাবে।
মানুষ আর আগের মতো বই পড়ে না কেনঅস্ট্রেলিয়ার একদল গবেষকের গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে কোনো অভ্যাস পুরোপুরি গড়ে উঠতে অন্তত দুই থেকে পাঁচ মাস সময় লাগতে পারে।
নিজের পছন্দের বিষয় দিয়ে শুরু হোক
যে বইগুলো পড়তে আপনার একদমই ভালো লাগে না, সেগুলো দিয়ে শুরু করলে আপনি কখনোই বইয়ের কাছে ফিরবেন না। তাই শুরুতে আপনার পছন্দের বিষয়গুলোকেই বেছে নিন।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা দ্য রিডিং এজেন্সির একটি রিপোর্টে দেখা গেছে, মুভি, টিভি শো বা পডকাস্ট অনেক সময় বই পড়ার আগ্রহ তৈরি করে। অনেক মানুষই জানিয়েছেন, কোনো মুভি বা টিভি শো দেখার পর তারা ওই কাহিনীর মূল বইটি পড়তে আগ্রহী হয়েছেন। তাই আপনি যদি কোনো মুভি বা সিরিজের ভক্ত হয়ে থাকেন, তবে সেটা যে বইয়ের ওপর ভিত্তি করে বানানো, সেই বইটা দিয়েই শুরু করতে পারেন। সবচেয়ে বড় কথা, কোনো বই পড়ে যদি আনন্দ না পান, তবে সেটা সঙ্গে সঙ্গে বাদ দিয়ে দিন! বই শেষ করার চেয়ে পড়ার অভ্যাস তৈরি করা এখন আপনার জন্য বেশি জরুরি।
ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করলে বই পড়ার অভ্যাস ধরে রাখার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়শুরু হোক ছোট পদক্ষেপে
নতুন অভ্যাস গড়ার শুরুর দিকটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় অতিরিক্ত উৎসাহী হয়ে বিশাল কোনো টার্গেট নিলে দ্রুতই হতাশ হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। ভারতের বেঙ্গালুরুর জেভিয়ার ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের একদল গবেষক বলছেন, ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করলে বই পড়ার অভ্যাস ধরে রাখার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। তারা পরামর্শ দিয়েছেন, ‘প্রতিদিন মাত্র ১৫ মিনিট বই পড়ার মতো ছোট লক্ষ্য ঠিক করুন। ধীরে ধীরে এই সময় আরও বাড়ান।’
যে ৫ কারণে প্রতিদিন বই পড়া উচিতযুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা দ্য রিডিং এজেন্সির একটি রিপোর্টে দেখা গেছে, মুভি, টিভি শো বা পডকাস্ট অনেক সময় বই পড়ার আগ্রহ তৈরি করে।
যোগ দিতে পারেন বুক ক্লাবে
মানুষকে কোনো কাজে আটকে রাখার ক্ষেত্রে সামাজিক চাপের চেয়ে কার্যকর আর কিছুই নেই! আর ঠিক এই কারণেই বুক ক্লাবগুলো এত জনপ্রিয়।
একদল বন্ধু মিলে যখন সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা সবাই একই বই পড়বে এবং সেটা নিয়ে আড্ডা দেবে, তখন কিন্তু না পড়ে উপায় থাকে না! কোনো বুক ক্লাবে যোগ দিলে বা বন্ধুদের নিয়ে এমন একটা গ্রুপ বানালে আপনি বই শেষ করার একটা তাগিদ অনুভব করবেন।
বন্ধুদের সঙ্গে চা, কফি খেতে খেতে বই নিয়ে আড্ডা দেওয়ার মজাই আলাদা!এই সামাজিক চাপটা যে কতটা জাদুকরী, তা নিজে পরীক্ষা না করলে বুঝবেন না। তাছাড়া বন্ধুদের সঙ্গে চা, কফি বা প্রিয় কোনো স্ন্যাকস খেতে খেতে বই নিয়ে আড্ডা দেওয়ার মজাই আলাদা!
প্রিয় কোনো বই পড়তে পারেন আরেকবার
ছোটবেলায় কি আপনি জুলভার্ন, মাসুদ রানা কিংবা হ্যারি পটার পড়ে মুগ্ধ হতেন? যদি আবারও বই পড়ার জগতে ফিরতে চান, তবে জীবনের ফেলে আসা সেই প্রিয় বইগুলো আবার পড়ে দেখতে পারেন। বড় হওয়ার একটা দারুণ সুবিধা হলো, ছোটবেলার প্রিয় গল্পগুলোকে সম্পূর্ণ নতুন এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়। পুরোনো চরিত্রগুলোকে এখন আপনার অন্য রকম লাগবে। অনেক ছোট ছোট ডিটেইল চোখে পড়বে, যা আগে আপনি খেয়ালই করেননি! তাছাড়া, পুরোনো প্রিয় বই পড়ার মধ্যে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি থাকে, যা নতুন অভ্যাস গড়ার সময় ভীষণ কাজে দেয়।
বিজ্ঞানীদের বইকোনো বুক ক্লাবে যোগ দিলে বা বন্ধুদের নিয়ে এমন একটা গ্রুপ বানালে আপনি বই শেষ করার একটা তাগিদ অনুভব করবেন। তাছাড়া বন্ধুদের সঙ্গে চা, কফি খেতে খেতে বই পড়ার মজাই আলাদা!
অডিওবুক হতে পারে দারুণ বিকল্প
অনেকেই নাক সিঁটকে বলতে পারেন, ‘কানে শুনে আবার বই পড়া হয় নাকি! ওটা তো আসল পড়া না।’ এসব কথা একদম পাত্তা দেবেন না!
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকদের ২০১৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিজের চোখে বই পড়েন আর যারা অডিওবুক শোনেন, তাদের গল্প বোঝার বা মনে রাখার ক্ষমতায় কোনো পার্থক্য নেই! অর্থাৎ, আপনি চোখ দিয়ে পড়ে যতটুকু তথ্য মনে রাখতে পারবেন, কান দিয়ে শুনেও ঠিক ততটুকুই মনে রাখতে পারবেন। যারা কাজের চাপে বই পড়ার সময় পান না, তাদের জন্য অডিওবুক একটা আশীর্বাদ। জ্যামে বসে, হাঁটার সময় বা ঘরের কাজ করার সময় অনায়াসেই অডিওবুক শোনা যায়।
কিনে নিতে পারেন ই-রিডার
কাগজের বইয়ের গন্ধ ও অনুভূতির কোনো তুলনা হয় না। প্রিয় বইগুলোর হার্ডকপি সংগ্রহে রাখাটা দারুণ ব্যাপার। কিন্তু সত্যি বলতে, কিন্ডল বা কোবোর মতো ই-রিডারও এখন বেশ জনপ্রিয়।
ই-রিডারে কড়া রোদেও বই পড়া যায়, চোখের কোনো ক্ষতি হয় নাপ্রথমত, এটা খুব সহজে বহন করা যায়। ভ্রমণে গেলে আপনি একটা ছোট ডিভাইসেই কয়েক হাজার বই সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে পারবেন। সবচেয়ে বড় কথা, ই-রিডারের স্ক্রিন আপনার সাধারণ মোবাইল বা ট্যাবের মতো নয়। এতে ই-ইংক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যা দেখতে একদম আসল কাগজের মতোই লাগে। এর সুবিধা অনেক। কড়া রোদেও পড়া যায়, চোখের কোনো ক্ষতি হয় না। ব্যাটারি অনেক দিন টেকে এবং মোবাইলের মতো নীল আলো ছড়িয়ে আপনার ঘুমেরও কোনো ব্যাঘাত ঘটায় না।
আরেকটা বড় সুবিধা হলো, এতে কোনো সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেশন এসে আপনাকে বিরক্ত করবে না। বই পড়ার অভ্যাস গড়ার জন্য মনোযোগ ধরে রাখাটা খুব জরুরি। তাই মোবাইলের ঝুটঝামেলা ছাড়া শুধু পড়ার জন্য ই-রিডার একটা দারুণ ইনভেস্টমেন্ট।
২০২৬ সালে আসছে আন্তর্জাতিক যেসব বিজ্ঞানের বইআপনি চোখ দিয়ে পড়ে যতটুকু তথ্য মনে রাখতে পারবেন, কান দিয়ে শুনেও ঠিক ততটুকুই মনে রাখতে পারবেন। যারা কাজের চাপে বই পড়ার সময় পান না, তাদের জন্য অডিওবুক একটা আশীর্বাদ।
মোবাইল ফোন দূরে রাখুন
আপনার সবচেয়ে আরামদায়ক চেয়ারটিতে বসে বই পড়ার সময়ও হয়তো মোবাইলটা আপনার পাশেই থাকে। কিন্তু জানেন কি, এই মোবাইলটা আপনার মনোযোগ নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট?
জার্নাল অব দ্য অ্যাসোসিয়েশন ফর কনজিউমার রিসার্চ-এ প্রকাশিত ২০১৭ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মোবাইল ফোন শুধু আপনার চোখের সামনে বা একই ঘরে থাকলেই আপনার মনোযোগ কমে যায়! আপনি ফোন না ধরলেও বা সেটা সাইলেন্ট থাকলেও, শুধু ওর উপস্থিতিই আপনার ফোকাস নষ্ট করে দেয়।
তাই বই পড়ার সময় ফোনটা অন্য ঘরে রেখে আসুন। আর যদি রাতে বিছানায় শুয়ে পড়ার অভ্যাস থাকে, তবে ফোন চার্জে দিন বেডরুমের বাইরে।
আপনি পারবেনই!
বই পড়ার গুণের শেষ নেই। এটি আমাদের মস্তিষ্ককে সচল রাখে, ডিমেনশিয়া বা ভুলে যাওয়ার রোগ প্রতিরোধ করে, এমনকি অন্য মানুষের প্রতি আমাদের সহানুভূতিশীল হতেও সাহায্য করে। অন্য এক জগতে হারিয়ে যাওয়ার এই ক্ষমতাটা একটা সুপারপাওয়ার!
বই পড়া ডিমেনশিয়া বা ভুলে যাওয়ার রোগ প্রতিরোধ করেনিশ্চয়ই আপনি আরও বেশি বই পড়তে চান। আর আপনি চাইলেই এটা পারবেন! নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস রাখুন। শুধু ছোট একটা পদক্ষেপ দিয়ে শুরু করুন, নিজের পছন্দের বইগুলো পড়ুন, প্রয়োজনে অডিওবুক বা ই-রিডার ব্যবহার করুন। তাহলেই আপনি আবার পাঠক হয়ে উঠবেন!
লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকাসূত্র: পপুলার সায়েন্সগল্পে গল্পে বিজ্ঞান শেখার বই