১ মার্চ তেহরান থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হলো—ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি হোসেইনি খামেনি লক্ষ্যভেদী হামলায় নিহত হয়েছেন। তার আগের দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আঘাতেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক আলোচনা যখন চলছিল, সেই প্রক্রিয়ার মাঝখানেই একজন ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা—এ শুধু একটি দেশের শোকের বিষয় নয়, এটিকে সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক গভীর ফাটলরেখা বলা যেতে পারে।
কিন্তু এই ঘটনার অভিঘাতের পাশাপাশি আরও একটি বিষয় সমানভাবে চোখে পড়ছে। সেটি হলো—নয়াদিল্লির অস্বস্তিকর নীরবতা।
ভারত সরকার এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেনি; ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিরুদ্ধেও সরব হয়নি।
যে কারণে ইরানের একজন খামেনি লাগবেইপ্রথম প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ব্যাপক হামলার প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে কেবল সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের পাল্টা আঘাতের সমালোচনায় সীমাবদ্ধ ছিলেন।
পরে তিনি ‘গভীর উদ্বেগ’-এর কথা বলেন; ‘সংলাপ ও কূটনীতি’র প্রয়োজনীয়তার উল্লেখ করেন। কিন্তু যে সংলাপ চলছিল, যে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অগ্রসরমাণ ছিল, সেই পরিসরেই তো উসকানি ছাড়াই এই হামলা হলো।
প্রশ্ন উঠতেই পারে—বিদেশি এক রাষ্ট্রপ্রধানের লক্ষ্যভিত্তিক হত্যার ঘটনায় যদি ভারত সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান না নেয়, তবে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির নৈতিক ভিত্তি কোথায় দাঁড়ায়?
এই নীরবতা নিরপেক্ষতা নয়। যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই, আলোচনার টেবিল অক্ষত রেখেই এমন হামলা চালানো হয়েছে।
মাদুরো থেকে খামেনি: পরাশক্তির চাপে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বজাতিসংঘ সনদের ২ (৪) অনুচ্ছেদ স্পষ্ট ভাষায় বলে—কোনো রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা তার হুমকি নিষিদ্ধ।
দায়িত্বে থাকা এক রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা সেই নীতির কেন্দ্রে আঘাত। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র যদি এর বিরুদ্ধে নীতিগত আপত্তি তুলতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়, তবে আন্তর্জাতিক বিধিব্যবস্থার ক্ষয়কে স্বাভাবিক করে তোলা সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে।
হামলার সময়কালও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। হত্যাকাণ্ডের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে প্রধানমন্ত্রী মোদি ইসরায়েল সফর সেরে দেশে ফিরেছেন।
সেখানে তিনি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের প্রতি নিরঙ্কুশ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন; অথচ এই সময়ে গাজায় চলমান সংঘাতে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ, বিশেষত নারী ও শিশু, নিহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে।
গ্লোবাল সাউথের বহু দেশ, এমনকি ভারতের ব্রিকস অংশীদার রাশিয়া ও চীন—ইসরায়েলের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখেছে। সেই প্রেক্ষাপটে নৈতিক স্বচ্ছতা ছাড়াই ভারতের এই হাই-প্রোফাইল সমর্থন ভারতের নিজের অবস্থান থেকে এক দৃশ্যমান ও উদ্বেগজনক সরে আসা।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিঘটনাটির অভিঘাত ভূরাজনীতির সীমানা ছাড়িয়ে গেছে; তার ঢেউ মহাদেশ পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আর ভারতের অবস্থান অনেকের কাছে নীরব সমর্থনের ইঙ্গিত বহন করছে।
ভারতের প্রধান বিরোধী দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস স্পষ্ট ভাষায় ইরানের মাটিতে বোমাবর্ষণ ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে।
আমরা একে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলার বিপজ্জনক পদক্ষেপ বলে মনে করি। ইরানের জনগণ এবং বিশ্বব্যাপী শিয়া সম্প্রদায়ের প্রতি আমরা সমবেদনা জানিয়েছি।
সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির নীতিতে প্রতিষ্ঠিত—এই বিষয়টি আমরা পুনর্ব্যক্ত করেছি।
সার্বভৌম সমতা, অনধিকার হস্তক্ষেপ না করা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার—এগুলো কেবল নীতিবাক্য নয়, ভারতের কূটনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তি।
বর্তমান নীরবতা তাই কৌশলগত হিসাবের বাইরে গিয়ে ঘোষিত নীতির সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
খামেনিকে হত্যা: ইরান এখন কোন পথে এগোবে?ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ইরানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেবল কৌশলগত নয়, সভ্যতাগতও।
১৯৯৪ সালে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি)-এর একাংশ যখন কাশ্মীর প্রশ্নে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনে ভারতের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনার উদ্যোগ নেয়, তেহরান সেই প্রচেষ্টা ভেস্তে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।
ভারতের অর্থনৈতিক অভিযাত্রার সূক্ষ্ম এক সময়ে কাশ্মীর ইস্যুর আন্তর্জাতিকীকরণ ঠেকাতে সেই ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
পাশাপাশি, গওয়াদার বন্দর ও চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের পাল্টা ভারসাম্য রক্ষায় পাকিস্তান সীমান্তসংলগ্ন জাহেদানে ভারতের কূটনৈতিক উপস্থিতি ইরানের সহযোগিতাতেই সম্ভব হয়েছে।
২০০১ সালের এপ্রিল মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি তেহরান সফরে গিয়ে ভারতের সঙ্গে ইরানের গভীর, ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক সম্পর্কের কথা উষ্ণতার সঙ্গে স্মরণ করেছিলেন। সেই স্মৃতি আজকের সরকারের কাছে যেন গুরুত্বহীন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার ঘটনায় ভারতের কাশ্মীরের শ্রীনগরে শিয়া মুসলমানেরা বিক্ষোভ করেন। পরে নিরাপত্তা কর্মীরা গুলি ও টিয়ার শেল ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করেন। খামেনি হত্যার প্রতিবাদ কর্মসূচির ওপর সেখানে প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।অবশ্যই, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক প্রতিরক্ষা, কৃষি ও প্রযুক্তিতে বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু তেহরান ও তেল আবিব—উভয়ের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যেই তো ভারতের কূটনৈতিক শক্তি।
সংযমের আহ্বান জানানোর সেই পরিসর টিকে থাকে বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। আর বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে ওঠে নীতির ভিত্তিতে, সুবিধাবাদের নয়।
এ কেবল নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, কৌশলগত প্রয়োজনও। উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় এক কোটি ভারতীয় কর্মরত। অতীতের উপসাগরীয় যুদ্ধ, ইয়েমেন, ইরাক ও সিরিয়ার সংকটে ভারত তার নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে পেরেছে স্বাধীন নীতিনিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে—কোনো শক্তিধর দেশের প্রতিভূ হয়ে নয়।
এই বিশ্বাসযোগ্যতা আকস্মিক নয়। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের পররাষ্ট্রনীতি নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল।
ভারত বহুদিন ধরে ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ বা ‘বিশ্ব এক পরিবার’—এই আদর্শের কথা বলে এসেছে। এটি কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনীতির স্লোগান নয়; ন্যায়, সংযম ও সংলাপের প্রতিশ্রুতি। মনে রাখা দরকার, বিধিনির্ভর আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা যখন চাপের মুখে, তখন নীরবতা মানে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া। ভারত কেবল আঞ্চলিক শক্তি হতে চায়নি; সে চেয়েছে বিশ্বের বিবেকের কণ্ঠস্বর হতে।
আর তা নিষ্ক্রিয় নিরপেক্ষতা নয়, বরং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের সচেতন ঘোষণা হিসেবে গড়ে উঠেছিল। পরাশক্তিদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজেকে বিলীন না করার অঙ্গীকার ছিল তার মর্ম।
আজ প্রশ্ন উঠছে—সেই অবস্থান কি শিথিল হচ্ছে? শক্তিধর রাষ্ট্রের একতরফা সামরিক পদক্ষেপের মুখে নীরবতা সেই ঐতিহ্য থেকে সরে আসার লক্ষণ।
ভারত নিজেকে গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চায়। কিন্তু সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন যদি বিনা প্রতিক্রিয়ায় মেনে নেওয়া হয় (যেমন ইরানের ক্ষেত্রে) তবে ক্ষুদ্র শক্তিগুলো শক্তিধরদের ইচ্ছাধীন হয়ে পড়ে।
ভারত বহুবার বিধিনির্ভর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে কথা বলেছে, যা দুর্বলদের জোরজবরদস্তি থেকে রক্ষা করবে। সেই কথা যদি পরীক্ষার মুহূর্তে উচ্চারিত না হয়, তবে তা বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।
গ্লোবাল সাউথের দেশগুলি যদি আজ সে দ্বিধাগ্রস্ত হয়, তাহলে আগামীকাল কেন তারা ভারতের ওপর আস্থা রাখবে?
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার উপযুক্ত মঞ্চ হলো পার্লামেন্ট। পার্লামেন্ট পুনরায় বসলে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার ভাঙন নিয়ে এই নীরবতা খোলামেলা বিতর্কে আসা উচিত।
বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে টার্গেট করে হত্যা করা, আন্তর্জাতিক নীতির ক্ষয়, পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা—এসব ভারতের কৌশলগত স্বার্থ ও নৈতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এখন সময়ের দাবি। গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ও কৌশলগত স্বচ্ছতা—দুটিই ভারত চায়।
ভারত বহুদিন ধরে ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ বা ‘বিশ্ব এক পরিবার’—এই আদর্শের কথা বলে এসেছে। এটি কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনীতির স্লোগান নয়; ন্যায়, সংযম ও সংলাপের প্রতিশ্রুতি।
মনে রাখা দরকার, বিধিনির্ভর আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা যখন চাপের মুখে, তখন নীরবতা মানে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া। ভারত কেবল আঞ্চলিক শক্তি হতে চায়নি; সে চেয়েছে বিশ্বের বিবেকের কণ্ঠস্বর হতে।
সার্বভৌমত্ব, শান্তি, অহিংসা ও ন্যায়ের পক্ষে অসুবিধা সত্ত্বেও কথা বলার সাহসেই সেই মর্যাদা গড়ে উঠেছিল।
আজ প্রয়োজন সেই নৈতিক শক্তিকে পুনরুদ্ধার করে স্পষ্ট ও দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করা।
সোনিয়া গান্ধী ভারতের কংগ্রেস পার্টির সংসদীয় দলের চেয়ারপারসন ও রাজ্যসভার সদস্য।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া
অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
